যে দেশটিকে তাঁর পিতা শেখ মুজিবুর রহমান এক বৈরী পাকিস্তানের বুক থেকে ছিনিয়ে এনেছিলেন, সেখান থেকে শেখ হাসিনাকে বিতাড়িত করার পর প্রায় দুই বছর কেটে গেছে। দেশে মৃত্যুদণ্ডের মুখোমুখি এবং তাঁর দল আওয়ামী লীগ বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হওয়ায় সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর পরিস্থিতি এর চেয়ে খারাপ হতে পারত না।
কিন্তু আমেরিকার খ্যাতিমান জেনারেল ডগলাস ম্যাকআর্থারের মতোই তিনি অবিচল। নির্বাসন থেকে আওয়ামী লীগ নেত্রী ঘোষণা করেন, “আমি এই বছরই দেশে ফিরব।” তিনি জোর দিয়ে বলেন যে, তাঁর দল কেবল একটি সংগঠন নয়, এটি একটি “শক্তি”। সংখ্যালঘুদের ওপর যেকোনো হামলা বাংলাদেশের স্বাধীনতার ওপর হামলা বলেও তিনি উল্লেখ করেন। দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে গত মঙ্গলবার (২৩ জুন) আওয়ামী লীগ তার ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন করেছে। কঠোর নিরাপত্তার মধ্যে দলটির ডজনখানেক কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
এনডিটিভি-কে দেওয়া এক এক্সক্লুসিভ ইমেইল সাক্ষাৎকারে নির্বাসিত এই নেত্রী বাংলাদেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে কথা বলেছেন। সাক্ষাৎকারের অনুলিপিটি নিচে দেওয়া হলো:
প্রশ্ন: আপনি প্রায়শই ইঙ্গিত দিয়েছেন—এবং আপনার সমর্থকরাও বেশ উজ্জীবিত—যে আপনি শীঘ্রই বাংলাদেশে ফিরে আসতে পারেন। কিছু নেতা তো এমনও বলছেন যে এটি এই বছরের মধ্যেই ঘটতে পারে। আপনার বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় থাকা সত্ত্বেও এটি কতটা বাস্তবসম্মত?
হাসিনা: আমার ফেরা কোনো ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয় নয়। এটি অনেক বড় একটি বিষয়ের সাথে যুক্ত: বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক অধিকার, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার, আইনের শাসন এবং আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। আমি ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করি না। আমি রাজনীতি করি বাংলাদেশের মানুষের কল্যাণের জন্য এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘সোনার বাংলা’ গড়ার স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য।
আমার বিরুদ্ধে যে রায় দেওয়া হয়েছে তা কোনো বিচার নয়। এটি একটি অবৈধ, অসাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রক্রিয়ার অংশ। আওয়ামী লীগকে নেতৃত্বহীন করার জন্য বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার হাতিয়ারে পরিণত করা হয়েছে। এর আগেও এমন চেষ্টা করা হয়েছে। তারা তখনও ব্যর্থ হয়েছিল, এবারও ব্যর্থ হবে।
আমি মৃত্যুকে ভয় পাই না। ১৯৭৫ সালে আমি আমার বাবা-মা, ভাই এবং প্রায় পুরো পরিবারকে হারিয়েছি। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আমাকে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। আমার বিরুদ্ধে অনেক ষড়যন্ত্রের জাল বোনা হয়েছে। কিন্তু সব ষড়যন্ত্রের জাল ছিন্ন করে আমি বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছি। জনগণের ভোটে আমি পাঁচবার প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়ে দেশের অভূতপূর্ব উন্নয়নের জন্য কাজ করেছি। আমার প্রায় পুরো জীবনটাই বাংলাদেশের মানুষের সাথে, আওয়ামী লীগের সাথে, গণতান্ত্রিক সংগ্রামের সাথে এবং বাংলাদেশের উন্নয়নের সাথে জড়িয়ে আছে। তাই আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই: সব বাধা ও ষড়যন্ত্র পেরিয়ে আমি এই বছরই আমার দেশে ফিরব।
প্রশ্ন: বাংলাদেশ সরকারের কিছু দৃশ্যমান ঘাটতির কারণে আওয়ামী লীগ আবারও জনসমর্থন ফিরে পাচ্ছে বলে ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দলটির কি এই সমর্থনকে রাজনৈতিক সাফল্যে রূপান্তর করার মতো সাংগঠনিক শক্তি আছে?
হাসিনা: আওয়ামী লীগ কোনো কাগজের সংগঠন নয়। এটি বাংলার মাটিতে, বাংলার মানুষের মনে, বাংলার ইতিহাসে এবং বাঙালি জাতির পরিচয়ের সাথে মিশে থাকা একটি রাজনৈতিক শক্তি। ৭৭ বছরের যাত্রায় আওয়ামী লীগ বহুবার আক্রান্ত হয়েছে, বহুবার রক্ত দিয়েছে এবং বহুবার নিষিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু প্রতিবারই জনগণের শক্তিতে ভর করে এটি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন অন্য কারো ব্যর্থতা বা দুর্বলতার ওপর নির্ভর করে না। আওয়ামী লীগ জনগণকে সাথে নিয়ে নিজের পথ নিজেই তৈরি করে। জনসমর্থন সবসময় আমাদের সাথেই ছিল। সেই শক্তি নিয়েই সরকারে থাকাকালীন আমরা মানুষের জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করেছি। বাংলাদেশ-বিরোধী শক্তিগুলো জনগণের একটি অংশকে বিভ্রান্ত করে একটি ষড়যন্ত্রমূলক ও সুপরিকল্পিত আন্দোলনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়। কিন্তু তাদের সমস্ত চেষ্টা সত্ত্বেও তারা মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে মুছে ফেলতে পারেনি।
মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অবৈধ, অসাংবিধানিক ও দখলদার অন্তর্বর্তী সরকার এবং এখন মঞ্চস্থ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের অধীনে মানুষ নিজের চোখে বাস্তবতা দেখছে। কোনো গণতন্ত্র নেই, আইনের শাসন নেই, নিরাপত্তা নেই। অর্থনীতি দুর্বল হয়ে পড়েছে। সংখ্যালঘুরা আক্রমণের শিকার হচ্ছে। চরমপন্থা ছড়িয়ে পড়ছে। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা অকল্পনীয় রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের মুখোমুখি হচ্ছেন। মানুষ এখন তুলনা করতে জানে। তারা বোঝে যে আওয়ামী লীগ সরকারে থাকলে দেশে স্থিতিশীলতা থাকে, উন্নয়ন হয় এবং মানুষের জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তা থাকে।
সাংগঠনিক শক্তির কথা বললে, আওয়ামী লীগ বাংলাদেশের রাজনীতির প্রতিটি অলিগলি নিজের হাতের তালুর মতো চেনে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে এই দলটির হাত ধরেই বাংলাদেশের জন্ম হয়েছে। আমরা দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছি। জনগণের সমর্থন ও আকাঙ্ক্ষাকে রাজনৈতিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার ক্ষমতা আওয়ামী লীগের ডিএনএ-তেই রয়েছে। আগুনে পুড়লে সোনা যেমন খাঁটি হয়, ঠিক তেমনি শাসকদের অত্যাচার ও নির্যাতন আওয়ামী লীগকে দিন দিন আরও শক্তিশালী করে তুলছে।
দলের ৭৭তম বছরে আমাদের নেতা, কর্মী ও সমর্থকদের প্রতি আমার বার্তা সহজ: ঐক্যবদ্ধ থাকুন এবং জনগণের পাশে দাঁড়ান। প্রতিটি গ্রাম, পাড়া, ওয়ার্ড এবং ইউনিয়নে মানুষের সাথে সম্পর্ক আরও গভীর করুন। নির্যাতিতদের পাশে দাঁড়ান। সংখ্যালঘু, নারী, শিশু, শ্রমজীবী মানুষ, দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মর্যাদার প্রশ্নে আপসহীন হোন। আওয়ামী লীগের রাজনীতি প্রতিশোধের জন্য নয়। এটি অধিকার, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও উন্নয়নের রাজনীতি। আওয়ামী লীগ জনগণের সাথে ছিল, জনগণের সাথে আছে এবং জনগণের সাথেই থাকবে। জনগণের শক্তির মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ আবারও জেগে উঠবে।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকা এবং দলের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে হাজার হাজার মামলা হওয়ার কারণে, নিকট ভবিষ্যতে দলটির রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কতটা সম্ভব?
হাসিনা: আওয়ামী লীগের রাজনৈতিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানো কোনো সরকারের অনুগ্রহের ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে জনগণের ওপর। একটি অবৈধ নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে তারা হয়তো আওয়ামী লীগকে একটি সাজানো নির্বাচনের বাইরে রাখতে পেরেছে, দলীয় কার্যালয়গুলো বন্ধ করে দিতে পেরেছে এবং সাময়িকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড স্তব্ধ করতে পেরেছে; কিন্তু মানুষের হৃদয় থেকে আওয়ামী লীগকে তারা মুছে ফেলতে পারেনি। আর এই কারণেই আওয়ামী লীগ ইতিমধ্যেই আবার জেগে উঠতে শুরু করেছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমস্ত নির্যাতন ও দমন-পীড়ন উপেক্ষা করে দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা, ইউনিয়ন ও এলাকায় প্রতিদিন আওয়ামী লীগের সমর্থনে মিছিল হচ্ছে। আওয়ামী লীগের কর্মী ও সমর্থকদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে এসব মিছিলে যোগ দিচ্ছে। মায়েরা তাদের সন্তানদের পাশে দাঁড়িয়ে সাহস ও সমর্থন জোগাচ্ছেন। এগুলোই প্রমাণ করে যে আওয়ামী লীগ আবার ঘুরে দাঁড়াচ্ছে।
বর্তমান সরকারের আচরণই প্রমাণ করে যে তারা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক শক্তিকে ভয় পায়। সে কারণেই আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচি বন্ধ করতে তারা সেনাবাহিনী, বিজিবি (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ) এবং পুলিশ মোতায়েন করেছিল। এটি তাদের দুর্বলতার লক্ষণ। বলপ্রয়োগ করে আওয়ামী লীগকে দমানো যাবে না। যে দল জনগণের মধ্যে জাগরণ সৃষ্টি করতে পারে, তাকে ভয় ও ভীতি প্রদর্শন করে থামানো যায় না। ইতিহাস আমাদের শিক্ষা দেয় যে, আওয়ামী লীগ কখনো শাসকদের রক্তচক্ষুকে ভয় পায় না। সেই রক্তচক্ষু উপেক্ষা করেই আওয়ামী লীগ বিজয়ের পতাকা ওড়ায়।
বাংলাদেশে একটি সঠিক গণতান্ত্রিক পরিবেশ এবং স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে আওয়ামী লীগের ওপর থেকে অবৈধ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার করতে হবে। রাজনৈতিক বন্দীদের মুক্তি দিতে হবে এবং শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অনুমতি দিতে হবে। কিন্তু এখন যারা ক্ষমতায় বসে আছেন তারা যদি এই ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পথও বন্ধ করে রাখেন, তবে জনগণের মধ্যে জমে থাকা ক্ষোভ, কষ্ট এবং গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষাই আওয়ামী লীগের জন্য নতুন পথ তৈরি করবে।
প্রশ্ন: আপনি বলেছেন যে, আপনাকে ক্ষমতা থেকে সরানোর পর বাংলাদেশ তার মূল চরিত্র হারিয়েছে এবং পাকিস্তানের মতো একটি মডেলের দিকে ধাবিত হচ্ছে। এই রূপান্তর বলতে আপনি ঠিক কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা কি একটু বিস্তারিত বলবেন?
হাসিনা: আমি কখনোই কোনো দেশের সঙ্গে স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্কের বিরোধিতা করিনি। জনগণের কল্যাণে বাংলাদেশ সবার সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখবে। আমাদের পররাষ্ট্রনীতি সবসময়ই স্পষ্ট: সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়। তবে সেই সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে রাষ্ট্রের মূল নীতি এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে অক্ষুণ্ন রেখে।
সামরিক শাসন, বৈষম্য, নিপীড়ন, সাম্প্রদায়িক রাজনীতি এবং গণতন্ত্রের অস্বীকৃতির বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের জন্ম হয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে আমরা যে রাষ্ট্রটি গঠন করেছিলাম, তা জাতীয়তাবাদ, গণতন্ত্র, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ছিল। সেই ভিত্তি দুর্বল করার অর্থ হলো বাংলাদেশের অস্তিত্বের মূলে আঘাত করা।
৫ই আগস্টের পর আমরা মুক্তিযুদ্ধের চেতনার ওপর এক সর্বাত্মক আঘাত দেখেছি। মুক্তিযোদ্ধাদের জুতোর মালা পরিয়ে অপমান করা হয়েছে। দেশজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিসৌধগুলো ভাঙচুর করা হয়েছে। ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়াকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। জাতির পিতার বাসভবনে বারবার হামলা হয়েছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর হামলা হয়েছে, মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে। সুফি মাজার এবং সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে। সন্ত্রাসবিরোধী কার্যক্রম দুর্বল করে চরমপন্থা ছড়ানোর সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশকে একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার সব রকম আয়োজন করা হয়েছে।
অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে আমরা স্থিতিশীলতা, আত্মবিশ্বাস এবং দৃশ্যমান অগ্রগতির এক বাংলাদেশ গড়ে তুলেছিলাম। ২০২৩ সালে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি রেকর্ড ৭.২৫ শতাংশে পৌঁছায় এবং মাথাপিছু আয় দাঁড়ায় ২,৭৯৩ মার্কিন ডলারে। বাংলাদেশ বিশ্বের ৩৫তম বৃহত্তম অর্থনীতিতে পরিণত হয়ে ২৯ ধাপ এগিয়ে যায়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধি পায় ৩৬ গুণ। জিডিপির তুলনায় বিনিয়োগের হার দাঁড়ায় ৩২.০৫ শতাংশে। সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগ পাঁচ গুণ বেড়ে ৩.৪৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছায়।
আমরা দারিদ্র্যের হার ১৮.৭ শতাংশে এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫.৬ শতাংশে নামিয়ে এনেছিলাম। খাদ্যশস্য উৎপাদন চার গুণ বেড়েছে। শিশু মৃত্যুর হার চার গুণ কমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা আট গুণ বেড়েছে এবং শতভাগ মানুষ বিদ্যুতের আওতায় এসেছে। সাক্ষরতার হার পৌঁছেছে ৭৮.৫ শতাংশে। কর্মক্ষেত্রে নারীর অংশগ্রহণ বেড়ে হয়েছে ৪৩.৪৪ শতাংশ। মানুষের দোরগোড়ায় স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে আমরা ১৪,৯৮৪টি কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপন করেছি।

আমরা ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারগুলোকে মর্যাদার সাথে পুনর্বাসন করেছি। প্রায় ৪২,৮০,১১৫ জন মানুষকে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে দুই শতাংশ জমিসহ বাড়ির মালিকানা দেওয়া হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, কর্ণফুলী টানেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ডিজিটাল বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইটের মতো মেগা প্রজেক্টগুলোর মাধ্যমে আমরা বাংলাদেশকে উন্নয়নের এক বৈশ্বিক রোল মডেলে পরিণত করেছি। আমরা প্রমাণ করেছি যে বাঙালি জাতি যদি সুযোগ, শান্তিপূর্ণ পরিবেশ এবং সৎ নেতৃত্ব পায়, তবে তারা নিজেদের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে।
৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশের উন্নয়নের যাত্রাকে যেভাবে ধ্বংস করা হয়েছে এবং যেভাবে জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করা হয়েছে, সেই পরিস্থিতি থেকে কেবল আওয়ামী লীগই দেশকে মুক্ত করতে পারে। জনগণ এটি বুঝতে পেরেছে। একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনে অংশ নেওয়ার সুযোগ দিলে আওয়ামী লীগ জয়ী হবে। ইউনূস এবং বাংলাদেশ-বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলো তা খুব ভালো করেই জানে। সে কারণেই অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকার জেনেবুঝে এবং পরিকল্পিতভাবে আওয়ামী লীগের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করেছে, একে নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বাইরে রেখেছে এবং দেশের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক ঐতিহ্যকে ধ্বংস করেছে। এটাই হলো সেই ব্যর্থ-রাষ্ট্রের মডেল, যা ৫ই আগস্টের পর বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
প্রশ্ন: আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং একটি সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করার বিষয়ে আপনার ও বিএনপি নেতৃত্বের মধ্যে গোপনে বা ব্যাকচ্যানেলে কোনো আলোচনা হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। এই দাবির মধ্যে কি কোনো সত্যতা আছে?
হাসিনা: ষড়যন্ত্রকারীরা প্রায়ই জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এ ধরনের অপপ্রচার চালায়। আমার অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। বাংলাদেশের গণতন্ত্র, আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অধিকার, জনগণের ভোটাধিকার এবং ন্যায়বিচার কোনো গোপন দরকষাকষির বিষয় নয়। এগুলো জনগণের সাংবিধানিক অধিকার।
আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়। এটি যেকোনো গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি ন্যূনতম প্রয়োজনীয়তা। ন্যায়বিচারও কোনো দান-খয়রাত নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। কোনো নাগরিক, রাজনৈতিক নেতা বা রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে যদি মামলা থাকে, তবে তা একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ এবং আইনি বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পরিচালনা করতে হবে। রাজনৈতিকভাবে পরিচালিত ট্রাইব্যুনাল, সাজানো মামলা, ভয় দেখিয়ে নেওয়া জবানবন্দি বা বিচার বিভাগের ওপর চাপ সৃষ্টি করে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায় না।
আমি সবসময়ই রাজনৈতিক সমাধানের পক্ষে। তবে সেই সমাধান হতে হবে উন্মুক্ত, নীতিগত এবং জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষার ওপর ভিত্তি করে। এটি কোনো গোপন চুক্তির ভিত্তিতে হতে পারে না। আওয়ামী লীগ কারো কাছে রাজনৈতিক করুণা ভিক্ষা করে না। আওয়ামী লীগ সাংবিধানিক অধিকার, জনসমর্থন এবং জনগণের শক্তির ভিত্তিতেই রাজনীতি করবে।

প্রশ্ন: সম্প্রতি হিন্দু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর এবং মন্দিরে হামলার খবর, সেই সাথে কিছু ইসলামপন্থী গোষ্ঠীর বিক্ষোভ ও হুমকির বিষয়গুলোকে আপনি কীভাবে দেখছেন?
হাসিনা: এটি অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং গভীর উদ্বেগের বিষয়। দুঃখের বিষয় হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। বাংলাদেশে যখনই মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি দুর্বল হয়েছে, যখনই সাম্প্রদায়িক শক্তি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছে বা প্রভাবিত করেছে, তখনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর ভয়াবহ নির্যাতন নেমে এসেছে। তাদের ঘরবাড়ি, উপাসনালয়, ব্যবসা-প্রতিষ্ঠান, জীবন ও মর্যাদা সবকিছু হুমকির মুখে পড়েছে।
৫ই আগস্টের পর থেকে হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান, আদিবাসী সম্প্রদায়, আহমদিয়া এবং সুফি মাজারের সাথে যুক্ত ব্যক্তিরা—কেউই নিরাপদ নন। মন্দির ভাঙচুর করা হয়েছে, প্রতিমা ভাঙা হয়েছে, ঘরবাড়ি লুটপাট করা হয়েছে। চাঁদাবাজি, নারীদের ওপর সহিংসতা এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে বাধা দেওয়া অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে ভীতিজনক বিষয় হলো, অবৈধ অন্তর্বর্তী সরকারের মতো বর্তমান বিএনপি সরকারও এসব ঘটনা অস্বীকার করছে অথবা এগুলোকে রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা বলে উড়িয়ে দিচ্ছে। এই অস্বীকৃতির সংস্কৃতি অপরাধীদের আরও উৎসাহিত করেছে। সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলা চিন্ময় কৃষ্ণ দাস এখনো মিথ্যা মামলায় কারাগারে বন্দি। এটিই প্রমাণ করে যে সরকার পরিবর্তন হলেও বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই: সংখ্যালঘুরা কোনো ভোট ব্যাংক নয়। তারা সমান মর্যাদার অধিকারী বাংলাদেশের নাগরিক। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিস্টানসহ সব সম্প্রদায়ের মানুষ ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করে দেশকে স্বাধীন করেছিল। বঙ্গবন্ধু একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখেছিলেন, যেখানে সব ধর্মের মানুষ সমান অধিকার নিয়ে বাস করবে। সেই বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক আগ্রাসন ও চরমপন্থার কাছে জিম্মি হতে দেওয়া যায় না।
যারা ধর্মের নামে সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা করে, মন্দির ভাঙচুর করে বা মানুষকে হুমকি দেয়, তারা কেবল একটি সম্প্রদায়ের শত্রু নয়; তারা বাংলাদেশের স্বাধীনতার চেতনার শত্রু। একটি রাষ্ট্র তখন ব্যর্থ হয় যখন একজন নাগরিককে তার ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে ভয়ে বাঁচতে হয়। আজ অনেক সংখ্যালঘু পরিবার সেই ভয়ের মধ্যে দিন কাটাচ্ছে। শুধুমাত্র নিরাপত্তার দাবিতে তাদের প্রতিবাদ করতে বাধ্য হতে হচ্ছে। স্বাধীন বাংলাদেশের জন্য এটি অত্যন্ত লজ্জাজনক।
সংখ্যালঘুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মন্দির ও উপাসনালয়ে হামলার বিচার হতে হবে। সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীগুলোর হুমকির বিরুদ্ধে রাষ্ট্রকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে। যারা শান্তিপূর্ণভাবে সংখ্যালঘুদের অধিকারের পক্ষে কথা বলেন, তাদের মিথ্যা মামলা বা হয়রানির মুখোমুখি করা উচিত নয়; বরং তাদের কথা শোনা উচিত। ধর্মীয় স্বাধীনতা, সমান অধিকার এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের একটি মৌলিক দায়িত্ব। এই দায়িত্বে ব্যর্থ হওয়া কেবল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ সমস্যাই নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার স্থিতিশীলতা ও মানবিক মূল্যবোধের জন্যও একটি উদ্বেগের বিষয়।
প্রশ্ন: ভারতে আপনার অবস্থান—ব্যক্তিগতভাবে আপনি এই সময়টা কীভাবে পার করছেন? আপনার মেয়ের সাথে কি প্রায়ই দেখা হয়, নাকি নির্বাসিত জীবন অনেকটাই সীমাবদ্ধতার মধ্যে কাটছে?
হাসিনা: দীর্ঘ সময় ধরে আমার ব্যক্তিগত জীবন বলে আসলে তেমন কিছু নেই। আমি আমার জীবন বাংলাদেশের মানুষের জন্য উৎসর্গ করেছি। ১৯৭৫ সালে আমি সবকিছু হারিয়েছি। তখনও আমাকে দীর্ঘ সময় নির্বাসনে কাটাতে হয়েছিল। পরবর্তীতে আমি দেশে ফিরে এসে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য লড়াই করেছি। আজ বাংলাদেশ আবারও একটি কঠিন সময় পার করছে। দেশের এই সংকটময় মুহূর্তে আমি সেখানে থাকতে পারছি না—এটি আমাকে গভীরভাবে ব্যথিত করে। আমাকে সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আমার পরিবারের সদস্যদের সাথে আমার স্বাভাবিক যোগাযোগ রয়েছে। কিন্তু আমার মন পড়ে আছে বাংলাদেশে: যে মাটিতে আমার পিতা শায়িত আছেন, যে দেশের মাটিতে আমার পরিবারের রক্ত মিশে আছে, যে দেশের মানুষের সেবা আমি সারা জীবন করেছি। আমার দেশের মানুষ থেকে দূরে থাকা, আমার মাটির গন্ধ থেকে দূরে থাকা এবং প্রতিদিন আমার নেতা-কর্মীদের কষ্টের কথা শোনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
আজ আমার ব্যক্তিগত জীবনের চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের অধিকার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দূর থেকে হলেও আমি প্রতিদিন দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করি। আমাদের নেতা-কর্মীদের খোঁজখবর রাখি। নির্যাতিত পরিবারগুলোর কষ্টের কথা শুনি। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের পরিস্থিতি তুলে ধরার চেষ্টা করি। আমার লড়াই থেমে থাকেনি।
আমার শক্তি হলো বাংলাদেশের মানুষ, আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং জাতির পিতার আদর্শ। সেই শক্তি নিয়েই আমি বাংলাদেশে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার এবং জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করতে প্রতিদিন কাজ করে যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, বাংলাদেশের মানুষ আবারও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনবে। জনগণের শক্তির মাধ্যমেই আওয়ামী লীগ আবার জেগে উঠবে। আমি এই সংগ্রামের সাথে আছি এবং আমার শেষ দিন পর্যন্ত এর সাথেই থাকব।


