জুলাই ষড়যন্ত্রের ‘শহীদ গেজেট’ এর শহীদ সংখ্যা সংযোজন – বিয়োজন সমাচার – ৯

এই গেজেটে আছে পুলিশের উপর হামলা, থানা-ফাঁড়ি-অস্ত্রাগার লুট ও অগ্নিসংযোগ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। কারাগার থেকে পালাতে গিয়ে, কারাগারে হামলা করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ীঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট - অগ্নিসংযোগ করার সময় নিজেদের আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। নিজের কাছে থাকা অস্ত্রের আত্মঘাতি গুলিতে, চাঁদাবাজী করতে গিয়ে গণপিটুনিতে, ধর্ষণের অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। এমনকি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, মবের আক্রমনের শিকার হয়ে নিহতদেরও নাম আছে এই গেজেটে।৩০শে জুন ২০২৫ইং - প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আরো ১০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে শহীদ গেজেট হালনাগাদ করা হয়। এরপর মোট শহীদ সংখ্যা হয় ৮৪৪ জন। আমার পোষ্টের কারণে হোক বা অন্য যে কোন কারনেই হোক কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়েছে। শহীদ গেজেট আবারো হালনাগাদ হয় গত ৩রা আগষ্ট, এবার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গেজেট থেকে বাদ যায় ৮ জনের নাম। এখন গেজেট অনুসারে শহীদ সংখ্যা ৮৩৬ জন।

অচেনা একজন
7 Min Read

জুলাই ষড়যন্ত্রকারীদের পক্ষ থেকে সর্বপ্রথম দাবি করা হয়েছিলো আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হাতে নিহত হয়েছে ৪ হাজার। পরবর্তীতে বাস্তবতা অনুভূত হওয়ায় সেই সংখ্যা ক্রমশঃ কমতে থাকে; পর্যায়ক্রমে ৩ হাজার, ২ হাজার এবং ১ হাজার ৪ শত জনে এই সংখ্যা নেমে আসে। জাতিসংঘ তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে লিখেছে ১লা জুলাই হতে ১৫ই আগষ্ট পর্যন্ত সারা দেশে নিহতের সংখ্যা ১ হাজার ৪ শত জন হতে পারে, যার মধ্যে ছাত্র, জনতা, পুলিশ, আনসার, র‍্যাবসহ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা রয়েছে।


অবশেষে ১৫ই জানুয়ারী প্রকাশিত শহীদ গেজেটে আসে ৮৩৪ জনের নাম, পটপরিবর্তনের আগে-পরে নিহত আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ-সংগঠনের নেতা-কর্মী-সমর্থকদের নাম বাদ দিয়ে প্রকাশ করা হয় এই গেজেট।


আগের অনুসন্ধানগুলোতে বলেছি, এই গেজেটে আছে পুলিশের উপর হামলা, থানা-ফাঁড়ি-অস্ত্রাগার লুট ও অগ্নিসংযোগ করতে গিয়ে পুলিশের গুলিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। কারাগার থেকে পালাতে গিয়ে, কারাগারে হামলা করতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীদের বাড়ীঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে লুটপাট – অগ্নিসংযোগ করার সময় নিজেদের আগুনে অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। নিজের কাছে থাকা অস্ত্রের আত্মঘাতি গুলিতে, চাঁদাবাজী করতে গিয়ে গণপিটুনিতে, ধর্ষণের অভিযোগে গণপিটুনিতে নিহত দুর্বৃত্তের নাম। এমনকি মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়, সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের জেরে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে, কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে, মবের আক্রমনের শিকার হয়ে নিহতদেরও নাম আছে এই গেজেটে।৩০শে জুন ২০২৫ইং – প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে আরো ১০ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করে শহীদ গেজেট হালনাগাদ করা হয়। এরপর মোট শহীদ সংখ্যা হয় ৮৪৪ জন। আমার পোষ্টের কারণে হোক বা অন্য যে কোন কারনেই হোক কর্তৃপক্ষ সচেতন হয়েছে। শহীদ গেজেট আবারো হালনাগাদ হয় গত ৩রা আগষ্ট, এবার প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে গেজেট থেকে বাদ যায় ৮ জনের নাম। এখন গেজেট অনুসারে শহীদ সংখ্যা ৮৩৬ জন।


আজ আলোচনা করবো গেজেট থেকে বাদ যাওয়া ৮ জন সহ সংশ্লিষ্ট আরো কিছু বিষয়।


১৫ই জানুয়ারী ঘোষিত গেজেটের ৬৬১ এবং ১৯৬ নাম্বারে ছিলো শাহজাহান এর নাম, ২২৪ এবং ২১৩ নাম্বারে ছিলো মুসলেহ উদ্দিন ওরফে সাগরের নাম, ৭৬৬ এবং ৪২০ নাম্বারে ছিলো রনী’র নাম।এখানে রনী’র নাম ও পিতার নাম হুবুহু একই, কেইস নাম্বার ও ঠিকানা ভিন্ন। আবার অন্য ২জনের ক্ষেত্রে শুধুমাত্র পিতার নাম মোটামুটি মিল আছে, কিন্তু ঠিকানা ও কেইস নাম্বারে সামঞ্জস্য নেই।এই ক্ষেত্রে দু’টি ঘটনা ঘটতে পারে, প্রথমত নিহতদের পক্ষ থেকে চরম ধূর্ততার আশ্রয় নেয়া হয়েছে অথবা ভূয়া নাম সংযোজন করে তালিকা দীর্ঘ করার একটি অপচেষ্টা করেছে কর্তৃপক্ষ।তৃতীয় প্রজ্ঞাপনে বাদ পড়া বাধন এর নাম প্রথম গেজেটে থাকার পরও প্রথম সংশোধনীর মাধ্যমে ৮৩৬ নম্বরে পুনরায় সংযুক্ত করা হয়েছিলো। এই নাম প্রথম গেজেটে থাকা ৩৮৪ নাম্বারের হুবুহু কপি করা।


তবে গেজেটে ২বার নাম অন্তর্ভুক্ত থাকলেই যে একটি নাম বাদ যাচ্ছে তাও কিন্তু না। মিনিমাম একজনের নাম দিচ্ছি যার নাম গেজেটে ২বার আছে। সিরিয়ালের ৬০৩ ও ৭৭৭ নাম্বারে থাকা হাসিবুর রহমান গত বছরের ৫ই আগষ্ট সাভারে পুলিশের গুলিতে নিহত হয়। এই ঘটনায় শেখ হাসিনাসহ ১,৫০৬ জনের বিরুদ্ধে সাভার মডেল থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
গেজেট থেকে বাদ যাওয়া আরেকজন হলো পুলিশ কনস্টেবল মোঃ খলিলুর রহমান তালুকদার। ২২৯ নাম্বার সিরিয়ালের খলিলুর রহমান কর্তব্যরত অবস্থায় গত বছরের ৫ই আগষ্ট শ্যামপুর থানা এলাকায় দুর্বৃত্তদের নৃশংস হামলা মারধরে আহত হয়, পরে ধানমন্ডির পপুলার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৪ই আগষ্ট বিকাল ৫টার দিকে মৃত্যুবরণ করে।


বলা হচ্ছে পুলিশ সদস্য হওয়ার কারণে গেজেট থেকে কনস্টেবল খলিলুর রহমান এর নাম বাদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু গেজেটে থাকা কমপক্ষে আরো একজন পুলিশ সদস্যের নাম দিচ্ছি যা এখনো গেজেটে আছে !!!


৪৫৬ নাম্বার সিরিয়ালে থাকা মো: মাসুদ পারভেজ ভূঁইয়া পিবিআই নারায়ণগঞ্জ জেলায় পুলিশ পরিদর্শক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। ১৯শে জুলাই বনশ্রী ফরাজী হাসপাতালের সামনে একদল দুর্বৃত্ত নৃশংস ভাবে শরীরজুড়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও রড দিয়ে পিটিয়ে জখম করে, পরবর্তীতে ২১শে জুলাই রাজারবাগ পুলিশ লাইনস হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে।
গেজেট থেকে বাকি ৩জনকে বাদ দেওয়ার কারণ হলো তারা কেউ তথাকথিত আন্দোলনে সম্পৃক্ত ছিলো না।
৩রা আগষ্টের প্রজ্ঞাপনে গেজেট থেকে বাদ দেওয়া জিন্নাহ মিয়া’র সিরিয়াল ৩৭৫ নাম্বার। গত বছরের ৬ই আগষ্ট ‘কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি’ জেল থেকে পালাতে গিয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহত হয়েছিলো জিন্নাহ মিয়া। এই বিষয়ে লিখেছিলাম প্রথম পর্বে। (পোষ্ট লিঙ্কঃ https://www.facebook.com/share/p/1C6QwaXRwn)


গেজেট থেকে বাদ দেওয়া ৮১৮ নাম্বার সিরিয়ালে ছিলো তাওহিদুল আলম জিসান এর নাম। জিসান গত বছরের ৩০জুলাই পারিবারিক দ্বন্দ্বের কারণে ছুরিকাঘাত নিহত হয়েছিলো।


নিহত জিসান এর পিতা আলমগীর মোল্লা বাদী হয়ে জিসানের বন্ধু নাঈম ও তাঁর বাবা কামালের নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরো ৩/৪ জনকে আসামি করে ৩১শে জুলাই রুপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।পটপরিবর্তনের পর ৩রা সেপ্টেম্বর তারিখে নিহত জিসান এর মামলাবাজ পিতা বাদী হয়ে আরো একটি সিআর মামলা দায়ের করে। এতে প্রথম মামলার এজাহারভুক্ত ২ আসামী সহ আরও ২৮ জনকে আসামি করে।অবাক করার বিষয় হলো, প্রথম মামলার ১ নাম্বার স্বাক্ষীকেও দ্বিতীয় মামলায় ৩ নাম্বার আসামী করা হয়েছে।গেজেট থেকে বাদ যাওয়া আরেকজন হলো পটুয়াখালীর বশির সরদার, গেজেটের সিরিয়াল আছে ৮২৩ নাম্বারে। জুলাইয়ের শুরু থেকে অসুস্থ ছিলো, পরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যবরণ করে।


আপনাদের নিশ্চয়ই খেয়াল আছে আগের পোষ্টগুলোতে বলেছিলাম যে, এই ‘শহীদ গেজেট’ তৈরী করতে গিয়ে পরিকল্পিতভাবে নানা চতুরতার আশ্রয় নেয়া হয়েছে। লক্ষ্য ছিলো যেভাবেই হোক তথাকথিত ‘শহীদ গেজেট’ এ শহীদ এর তালিকা দীর্ঘ করা তাই বিভিন্ন কারনে নিহত হওয়া মৃত্যুবরণ করা ব্যক্তিদের গেজেটে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। গেজেটে অন্তর্ভুক্ত ব্যক্তিদের নিহত হওয়ার তারিখ, সময়, ঘটনাস্থল, মারা যাওয়ার কারন উল্লেখ করা হয়নি, অনেক ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গ ঠিকানাও উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি নিহত ব্যক্তির বয়স এবং পেশাও উল্লেখ নাই। ইচ্ছাকৃত ভাবে অতি সহজ বাংলা বানান ভুল করা হয়েছে, তালিকাটি তৈরীতে বিভাগ বা জেলাওয়ারি কোন ক্রমপদ্ধতিও অনুসরন করা হয়নি।এমনকি ভূয়া নাম ও একই নামে বিভিন্ন পরিবর্তন এনে একাধিকবার তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এর একমাত্র উদ্দেশ্য হলো কোন নিহতের তথ্য পাওয়া, তালিকায় অন্তর্ভুক্ত কারো নাম যাচাই করা কিংবা সত্য-মিথ্যা নির্ধারণ করা যেন সবার পক্ষে অসম্ভব হয়ে যায়।


সামনে আরো পর্ব আসবে, সেসব পর্বেও থাকবে তথাকথিত শহীদ গেজেটে অন্তর্ভুক্ত শহীদদের বিষয়ে আরো কিছু চমকপ্রদ তথ্য।

error: Content is protected !!