জুলাই ষড়যন্ত্রের ‘শহীদ গেজেট’ সমাচার – পর্ব ৬

বিজিবির পোশাকে ভারতীয় বিএসএফ এবং 'র' এর সৈনিক গুজব ছড়িয়ে বিজিবির সদস্যদের উপর হামলা চালিয়ে হত্যা ও আনসার একাডেমীতে হামলা করতে গিয়ে নিহত শহীদ !!!পরিশেষে, ৫ই আগষ্ট গুলি চালানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে যথেষ্ট কারণ ছিলো। কারণ জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য, সরকারী সম্পত্তি রক্ষার জন্য, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য এবং আত্মরক্ষার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।

অচেনা একজন
8 Min Read

বিজিবির পোশাকে ভারতীয় বিএসএফ এবং ‘র’ এর সৈনিক গুজব ছড়িয়ে বিজিবির সদস্যদের উপর হামলা চালিয়ে হত্যা ও আনসার একাডেমীতে হামলা করতে গিয়ে নিহত শহীদ !!!

৫ই আগষ্ট ময়মনসিংহ থেকে বিজিবি সদস্যদের একটি দল নিজস্ব পিকআপ ও কয়েকটি বাসে করে ঢাকা যাচ্ছিলো। দুপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের মুলাইদ এলাকার বাংলাদেশ ফিলিং স্টেশনের সামনে আসলে প্রায় ৮০জন বিজিবি সদস্য থাকা দুটি বাসের গতিরোধ করে ‘বিএসএফ’ বলে চিৎকার করতে থাকে ছাত্র-জনতা নামধারী দুর্বৃত্তরা এবং গুজব ছড়ায় বাসে বিজিবি’র পোষাকে ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’ সদস্য বা বিএসএফ সদস্য আছে এবং এরা হিন্দি ভাষায় কথা বলে !!!

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ (?) করে দেশত্যাগ করেছেন প্রচারের পর দুর্বৃত্তরা দ্বিগুন উল্লাসে সক্রিয হয়। উপস্থিত বিজিবি সদস্যরা নিজেদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বারবার প্রত্যেকের আইডি কার্ড দেখাতে থাকে। এরপরও কোনো রকম কর্ণপাত না করে তারা বাস দুটিকে পেট্রোল পাম্পের কাছে নিয়ে যেতে বাধ্য করে, বাসের চাকার হাওয়া ছেড়ে দেয়। পরে বাসের ভিতর অবস্থানকারী বিজিবি সদস্যদের পুড়িয়ে দেওয়ার জন্য বাসের গায়ে পেট্রোল ঢালতে থাকে এবং বাসের তেলের ট্যাংকি ছিন্ন করে দেয়। একপর্যায়ে হামলাকারী দুর্বৃত্তরা বিজিবি সদস্যের কাছে থাকা অস্ত্রসহ গোলাবারুদ বস্তায় ভরে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং হত্যা করার উদ্দেশ্যে বিজিবি সদস্যদের ওপর চড়াও হয়, লাঠিসোটা দিয়ে প্রহার করতে থাকে। বিজিবি সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুড়ে। দুপুরের পর থেকে কয়েক ধাপে গোলাগুলির এই ঘটনায় বিজিবির ১১টি গাড়ি ভাঙচুর ও পুড়িয়ে দেওয়া হয়। ৮ জন হামলাকারী নিহত এবং অর্ধশতাধিক গুলিবিদ্ধ হয়।

দুর্বৃত্তরা নৃশংস ভাবে পিটিয়ে হত্যা করে বিজিবি সদস্য নায়েক মোহাম্মদ আব্দুল আলিম শেখ কে, এতে গুরুতর আহত হয় আরো ১০ জন বিজিবি সদস্য। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর কয়েকটি টিম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে রাত ৮টার পর অবরুদ্ধ বিজিবি সদস্যদের উদ্ধার করে নিয়ে যায়। https://www.dhakapost.com/country/296866

এই ঘটনায় বিজিবি’র গুলিতে নিহত ৮ জন শহীদ (!) এর নাম গেজেটে অন্তর্ভুক্ত হয়।

গেজেটে ১৩৫ নাম্বার সিরিয়ালে আছে আসীর ইনতিশারুল হক,

গেজেটের ২৭৫ নাম্বারে আছে মাছুম বিল্লাহ,

গেজেটের ৪৪৫ নাম্বার সিরিয়ালে আছে শিফাত উল্লাহ,

গেজেটের ৪৫২ নাম্বারে আছে শরীফুল ইসলাম,

গেজেটের ৪৮২ নাম্বারে আছে জাকির হোসেন রানা,

গেজেটের ৫০১ নাম্বারে আছে কাউসার মিয়া,

গেজেটের ৫৩৭ নাম্বার সিরিয়ালে আছে জুয়েল মিয়া এবং

গেজেটের ৭২২ নাম্বার সিরিয়ালে আছে রহমত মিয়া।

বিজিবির গুলিতে নিহত হওয়ার ঘটনায় ২৮শে আগষ্ট গাজীপুরের শ্রীপুর মডেল থানায় পৃথক দুটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। দুটি এজাহারে ঘটনার তারিখ ও স্থান একই উল্লেখ করা হলেও ঘটনার সময় ও হত্যার বর্ণনা আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

1. নিহত জাকির হোসেন রানা’র পিতা জামাল উদ্দিন বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ ৩৫ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরো ৪০০/৫০০ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে “৫ই আগস্ট বিকেল আনুমানিক ৪টার সময় ১ থেকে ১২ নম্বর আসামীদের নির্দেশক্রমে ১৩ থেকে ৩৭ নম্বর আসামীগন অতি উৎসাহিত বিজিবি সদস্যদের নিয়ে ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায়।” এবং

2. নিহত রহমত মিয়া’র পিতা মো: মুঞ্জু মিয়া বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ ৬০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরো ৫০০/৬০০ জনকে আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে “৫ই আগস্ট বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে বিজিবি সদস্যদের সাথে থাকা অস্ত্রগুলি ছিনিয়ে ও উপস্থিত আসামীগণদের নিকট থাকা অস্ত্র দিয়ে আন্দোলনরত ছাত্র-জনতার উপর নির্বিচারে গুলি চালায়।” ( https://www.dhakapost.com/country/302793 )

3. নিহত মো. শিফাত উল্লাহ’র পিতা মো. নুরুজ্জামান বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ ৪২ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরো ১৫০/২০০ জনকে আসামি করে ১লা সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলা দায়ের করে এবং

4. নিহত মো. কবিরের মা জামিলা খাতুন বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের সহ ৮৬ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরো ৪০০/ ৫০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামি করে ২রা সেপ্টেম্বর একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। (https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/zfb4zttgss )

5. একই দিনের ঘটনায় নিহত মাছুম বিল্লাহ’র মা মোছা. মুর্শিদা খাতুন বাদী হয়ে ২০শে ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ ৩৩৪ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরো ২৫০/৩০০ জনকে আসামি করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। https://www.dhakapost.com/country/346746

6. নিহত ইনতিশারুল হক এর পিতা এনামুল হক বাদী হয়ে সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক, সাবেক সংসদ সদস্য মুহাম্মদ ইকবাল হোসেন সবুজ, সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী রুমানা আলী টুসী সহ ২২৭ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাত আরো ১০০/১৫০ জনকে আসামী করে ৪ঠা অক্টোবর একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ( https://samakal.com/whole-country/article/259288/হত্যা-মামলায়-মৃত-ব্যক্তিও-আসামি ) উল্লেখ্য ২৫শে সেপ্টেম্বর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যবরণ করা কালা মিয়া নামে এক ব্যক্তিকেও আসামি করা হয়েছে।

7. নিহত জুয়েল মিয়া’র স্ত্রী জুবেদা আক্তার বাদী হয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সহ ১১০ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও অজ্ঞাতনামা ২০০ জনকে আসামী করে ৩রা সেপ্টেম্বর শ্রীপুর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। মামলার কার্ষক্রম পরিচালনার জন্য নিহতের লাশ ময়নাতদন্তের জন্য নির্দেশ দেয় আদালত।

অন্যদিকে গুজব ছড়িয়ে এক বিজিবি সদস্যকে পিটিয়ে হত্যা, বিজিবি সদস্যদের বহনকারী গাড়ি ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় অজ্ঞাতনামা কয়েক হাজার জনকে আসামি করে ১৯শে সেপ্টেম্বর গাজীপুরের শ্রীপুর থানায় বিজিবি’র ময়মনসিংহ সেক্টর সদর দপ্তরের নায়েব সুবেদার সোহেল রানা একটি মামলা দায়ের করে। ( https://www.tbsnews.net/bangla/বাংলাদেশ/news-details-258116

একই দিন অর্থাৎ ৫ই আগষ্ট বিকালে গাজীপুরে কালিয়াকৈরের সফিপুর আনসার-ভিডিপি একাডেমিতে দুর্বৃত্তরা সদলবলে হামলা চালায়। একাডেমির দুইটি প্রধান ফটক ও ভেতরের বিভিন্ন স্থাপনায় ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। আনসার সদস্যরা আত্মরক্ষার্থে গুলি ছুঁড়লে কয়েকজন নিহত হয়, এরমধ্যে ৬ জনের নাম শহীদ (!) গেজেটে স্থান পায়।

শহীদ গেজেটের ৮২ নাম্বার সিরিয়ালে আছে আয়াতুল্লাহ,

১২৮ নাম্বারে আছে অন্তর ইসলাম,

২৯৩ নাম্বারে আছে রুখতন মিয়া এবং

৪৭১ নাম্বারে আছে মাহফুজ,

৪৮৬ নাম্বারে আছে জুয়েল রানা এবং

৫১২ নাম্বারে আছে ইলিম হোসেন এর নাম।

1. নিহত আয়াতুল্লাহ’র পিতা সিরাজুল ইসলাম ১৮ই সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ২৩ জনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর কার্যালয়ে একটি অভিযোগ দায়ের করে।

2. এই ঘটনায় নিহত অন্তর হোসেনের চাচাতো ভাই সাইফুল ইসলাম বাদী হয়ে ২৫শে সেপ্টেম্বর সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক ও সাবেক নৌপরিবহনমন্ত্রী শাহাজাহান খানসহ আওয়ামী লীগের ২৩২ জনের নাম উল্লেখ করে এবং ৩০০/৪০০ জনকে অজ্ঞাতনামা আসামী করে একটি হত্যা মামলা দায়ের করে। ( https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/hrm9k2cgre )

3. নিহত রোস্তম মিয়ার স্ত্রী শেফালী বেগম বাদী হয়ে ২রা জুন সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সহ আওয়ামী লীগের ৩১৬ জন নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ করে ও অজ্ঞাতনামা আরো অনেকজনকে আসামী করে কালিয়াকৈর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করে।

4. নিহত মাহফুজের ভাই আপেল মাহমুদ আদালতের শরণাপন্ন হলে ৩০শে মে গাজীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থানায় মামলাটি করার নির্দেশ দেন। মাহফুজ হত্যা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে, সাবেক মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক সহ ৩৪ জন আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মী ও অজ্ঞাতনামা ৩০০/৪০০ জনকে আসামী করা হয়। ( https://www.prothomalo.com/bangladesh/district/fz76svo4r7 )

পরিশেষে, ৫ই আগষ্ট গুলি চালানোর জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের কাছে যথেষ্ট কারণ ছিলো। কারণ জনগণের জানমাল রক্ষার জন্য, সরকারী সম্পত্তি রক্ষার জন্য, বেআইনি সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করার জন্য এবং আত্মরক্ষার জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করতে পারে।

error: Content is protected !!