হামলার শিকার হয়ে ভুক্তভোগী ছাত্রলীগ। ১২৮ জন নেতাকর্মী বহিষ্কার। ঢাবিতে ১৫ জুলাইয়ে সহিংসতা: তদন্ত কমিটির সদস্যদের নিয়ে প্রশ্ন!
সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের নেতা সাবাত আল ইসলামকে মারধর করা হয় এবং মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার হয়। ছাত্রদলের বিজয় একাত্তর হলের প্রচার সম্পাদক তানভীর হাদী মায়েদ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘটনাটি স্বীকার করেন। ছাত্রদলের আরেক নেতা সুলায়মান হোসাইনও ফেসবুকে লিখেছেন, তারা সাবাতকে টেনে-হিঁচড়ে মারধর করেছেন।যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জানিয়েছেন সুলায়মান শিবিরের এজেন্ট হয়ে ছাত্রদলে অনুপ্রবেশ করেছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংঘটিত ২০২৪ এর ১৫ জুলাইয়ে সহিংসতার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিটির তিন সদস্য অতীতে একপক্ষীয় তদন্তের মাধ্যমে বিতর্কিত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। ১২৮ জন শিক্ষার্থীকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও অভিযুক্তদের আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
সমন্বয়ক, ছাত্রদল এবং শিবিরের নেতাকর্মীদের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের উপর হামলা এবং হলের গেট ভাংচুরের ভিডিও টি দেখুন
গত ১৫ জুলাই বিজয় একাত্তর হলে ছাত্রদল-শিবিরের হামলা কেন্দ্র করে দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এরপর ৮ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটির প্রধান করা হয় আইন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক কাজী মাহফুজুল হক সুপনকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সহকারী প্রক্টর শেহরিন আমিন ভূঁইয়া ও উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ আলমুজাদ্দেদী আলফেছানি।
তবে কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন অনেকে।
১৫ জুলাই শিবির এবং ছাত্রদলের হামলায় গুরুতর আহত ছাত্রলীগ নেতা সাবাত ও সাইমুম।
> “কিছুক্ষণের মধ্যেই আন্দোলনকারীদের মিছিলটি জিয়াউর রহমান হল থেকে বিজয় একাত্তর হলের ফটকের দিকে যায়। মিছিলটি হলের ফটকে যাওয়ার পর মাইকে বলা হয়, আন্দোলনকারীদের কয়েকজনকে বিজয় একাত্তর হল সংসদে আটকে রাখা হয়েছে। একপর্যায়ে মাইকে শিক্ষার্থীদের একাত্তর হলের ভেতরে ঢোকার আহ্বান জানানো হয়। বলা হয়, ‘সন্ত্রাসীদের ধরে নিয়ে আসুন।’ এরপর আন্দোলনকারীরা হলের বাগানে ঢুকে পড়েন এবং ইট-পাটকেল ছোড়া শুরু করেন।”
সংঘর্ষের এক পর্যায়ে বিজয় একাত্তর হল ছাত্রলীগের নেতা সাবাত আল ইসলামকে মারধর করা হয় এবং মাথা ফাটিয়ে দেওয়ার হয়। ছাত্রদলের বিজয় একাত্তর হলের প্রচার সম্পাদক তানভীর হাদী মায়েদ ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ঘটনাটি স্বীকার করেন। ছাত্রদলের আরেক নেতা সুলায়মান হোসাইন ও ফেসবুকে লিখেছেন, তারা সাবাতকে টেনে-হিঁচড়ে মারধর করেছেন।যদিও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতাকর্মী জানিয়েছেন সুলায়মান শিবিরের এজেন্ট হিসেবে ছাত্রদলে ঢুকেছে।
তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের সন্দেহ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ছাত্রলীগ কর্মী বলেন, “তদন্ত কমিটির সচিব ডেপুটি রেজিস্ট্রার শেখ আইয়ুব আলি জামায়াতপন্থি। সংঘর্ষের মূল হোতাদের গ্রেপ্তার না করে আত্মরক্ষায় থাকা ছাত্রলীগ কর্মীদের বহিষ্কার করা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ।”
বিতর্কিত সদস্যদের ভূমিকা
কাজী মাহফুজুল হক সুপন
অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছাত্রদের ইফতারের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। এ নিয়ে স্যার এফ রহমান হলে বিক্ষোভ হয় গত ১২ মার্চ।
ছাত্রলীগের এক নেতার দাবি,
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ ঢাকতে তিনি তড়িঘড়ি করে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন এবং পুরো ঘটনার দায় ছাত্রলীগের ওপর চাপানো হয়।
শেহরিন আমিন ভূঁইয়া সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়ার পুত্রবধূ। অভিযোগ রয়েছে, সেনাপ্রধান থাকার সময় ইকবাল করিম ভূঁইয়া ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন।
এছাড়া, শেহরিন আমিন ভূঁইয়া ইউএসএআইডির তহবিল নিয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানিয়েছেন, তিনি নীল দলের সক্রিয় সদস্য ছিলেন এবং তৎকালীন উপাচার্য মাকসুদ কামাল থেকে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা নিয়েছিলেন।
মুহাম্মদ আলমুজাদ্দেদী আলফেছানি
তিনি সাদা দলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং দলীয় কোন্দলে জড়িয়ে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে নিজ দল থেকেই বহিষ্কৃত হন। তার বিরুদ্ধে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়ন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।
তদন্ত কমিটি কতটা নিরপেক্ষ?
বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন মহল থেকে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে, বিতর্কিত ব্যক্তিদের নিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন কতটা যৌক্তিক? এই কমিটির প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ছাত্রলীগের ১২৮ জন নেতাকর্মীকে বহিষ্কারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে কারা বহিষ্কৃত হচ্ছেন, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি, তবে সবাই ছাত্রলীগের সথে সম্পৃক্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক জ্যেষ্ঠ শিক্ষকের ভাষায়,
“যারা নিজেরাই বিতর্কিত, তারা কীভাবে অন্যদের অপরাধ খুঁজে বের করবে?”
ছাত্রলীগের প্রতিক্রিয়া
বহিষ্কারাদেশ নিয়ে ছাত্রলীগ নেতারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের এক নেতা বলেন,
“আমাদের নেতা বঙ্গবন্ধুকেও বহিষ্কার করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, তারপর ইতিহাস কী হয়েছে, সবাই জানে। আমরা এসব ভয় পাই না।”
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ নেতা আরিফ ইশতিয়াক রাহুল ফেসবুকে লিখেছেন:
> “বহিষ্কার করলে করুন। সাময়িক নয়, স্থায়ী বহিষ্কার করুন। যতো কিছুই করেন, ছাত্রলীগের কেউ মাথা নত করবে না। শেখ হাসিনার পক্ষে থাকার জন্য যদি ছাত্রত্ব চলে যায়, তবে তাই হোক।”
এ ধরনের স্ট্যাটাস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হল এবং বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরাও দিয়েছেন।
তদন্ত কমিটির নিরপেক্ষতা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও কমিটি ইতোমধ্যে প্রতিবেদন জমা দিয়েছে, যেখানে ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়েছে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া পোস্ট ও ভিডিও বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ছাত্রদল-শিবির নেতাকর্মীরাও সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন বলে স্বীকার করেছেন। এছাড়া এক আগস্ট প্রকাশিত ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদনে জানা যায় ১৫-১৬ জুলাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ৩০০ টি কক্ষ ভাংচুর করে কোটা আন্দোলনকারীরা ঢাবির হলে ৩০০ কক্ষ ভাঙচুর : ক্ষতির পরিমাণ ৫ কোটি কোটা সংস্কার আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসে সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলার ঘটনায় প্রায় প্রতিটি হলেই ছাত্রলীগ নেতাদের কক্ষ ভাঙচুর করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের তথ্যমতে, প্রায় ৩শ রুম ভাঙচুরের ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষতি হয়েছে ৪ কোটি ৯৩ লাখ টাকা। সে হিসেবে প্রতিটি কক্ষ ভাঙচুরে ক্ষতির পরিমাণ ১ লাখ ৬৬ হাজার টাকারও বেশি।
ছাত্রলীগের কয়েকজন নেতা জানান
তারা জুলাইয়ের এই হামলার সময় ক্যাম্পাসে ছিলেন না তাদের রুম ভাঙচুর করা হয়েছে, তাদের গুরুত্বপুর্ন কাগজপত্র চুরি করা হয়েছে,ক্ষতিপূরণ পাননি বরং কয়েকটি মামলার ভুক্তভোগী, ফেরারী জীবন পার করছেন শেষ সাত মাস ধরে।
সংঘর্ষের সূত্রপাত যাদের দ্বারা হয়েছে তাদের ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়ার ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গত ১২ মার্চ ১২৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে বহিষ্কারের ঘোষণা দিয়েছে যেখানে সবাই ছাত্রলীগের নেতাকর্মী বলে নিশ্চিত হয়েছে ট্রু গেজেট।